খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ই জানুয়ারি ২০১৫, ১২:৯ পিএম

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় নড়াইল জেলার বিখ্যাত ব্যক্তি।
বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস, এম সুলতান (লাল মিয়া) 1923 সালের ১০ আগস্ট নড়াইল সদর উপজেলার মাছিমদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মেছের আলী। জন্মের কিছু দিনের মধ্যেই তাঁর মা মারা যান। ১৯২৮ সালে তিনি নড়াইল কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৪১ সালে হতে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত তিনি কলিকাতা সরকারি আর্ট ইনস্টিটিউটে চিত্র কলায় শিক্ষা গ্রহণ করেন।
১৯৪৮ সালে পাকিস্তানে, ১৯৫০ সালে আমেরিকায়, ১৯৫৩ সালে ইউরোপে তাঁর চিত্র প্রদর্শনী হয়। ১৯৫৩ সালে তিনি নড়াইলে ফিরে আসেন। বিশ্ব বরেণ্য এই শিল্পী ১৯৮২ সালে ২১ শে পদক, ১৯৮৪ সালে ‘‘বাংলাদেশ চারু শিল্পীসংসদ’’ সন্মামনা ও ১৯৯৩ সালে ‘‘স্বাধীনতা পদক’’ লাভ করেন। ১৯৮২ সালে ক্যামব্রীজ বিশ্ববিদ্যলয় তাঁকে ‘‘ম্যান অব এশিয়া’’ ও ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ সরকার ‘‘ আর্টিষ্ট ইন রেসিডেন্ট’’ সন্মানে ভূষিত করে। ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর এই মহান শিল্পী ইহলোক ত্যাগ করেন।

প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী উদয় শংকর ১৯০০ সালের ৮ ডিসেম্বরনড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার বড়কালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার কর্মস্থল ভারতের রাজস্থান হওয়ায় তিনি সেখানকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা গ্রহণ করেন। লন্ডনের রয়েল কলেজ অব আর্টস হতে তিনি চিত্র শিল্পে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন।উপ মহাদেশের শিল্প সাংস্কৃতির সাথে তিনি বিশ্বকে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নৃত্যকলা প্রদর্শনী করে মানুষের মন জয় করেন। ১৯৭২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তারিখে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ ১৯৩৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি নড়াইল সদর উপজেলার মহিষখোলা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। ১৯৫৯ সালের ১৪ মার্চ ২৩ বছর বয়সে তিনি তৎকালিন ইপিআর বাহিনীতে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণার প্রেক্ষিতে তিনি সর্বাত্মক যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। ৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১ সালে ৮ নং সেক্টরের অধীন যশোর জেলার শার্শা সীমান্তে যুদ্ধরত অবস্থায় প্রথমে আহত হন পরে পাকসেনাদের অত্যাচারে নিহত হন। ১৯৭৪ সালে এই মুক্তিযোদ্ধাকে স্বাধীনতার যুদ্ধের স্বীকৃতি স্বরুপ বীরশ্রেষ্ঠ পদবী ভূষিত করা হয়।
আধুনিক বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধ্রুপদী সংগীতজ্ঞ রবী শংকর ১৯২০ সালের ৭ এপ্রিল উত্তর ভারতেরকাশিতে জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর পৈত্রিক নিবাস ছিল নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার বড়কালিয়া গ্রামে। তার পিতার নাম শ্রী শ্যাম শংকর চৌধুরী ও মাতার নাম হেমাঙ্গীনি। মাত্র দশ বছর বয়সে তিনি তার ভ্রাতা উদয় শংকরের দলে যোগ দিয়ে প্যারিসে যাত্রা করেন। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার সংগ্রামে আর্থিক সহায়তার জন্য তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে বিশ্ব বিখ্যাত পঁচাত্তর জন শিল্পীর সাথে কনসার্ট ফর বাংলাদেশ অনুষ্ঠানে যোগদেন।সেতারের সুরের ঝংকারে তিনি আজও বিশ্ববাসীকে মোহিত করে রেখেছেন।
সাহিত্যিক নীহাররঞ্জন গুপ্ত ১৯১১ সালের ০৬ জুন নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলার ইতনা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা সরকারী চাকুরীজীবী হওয়ায় ডাক্তরী পাস করার পর সেনাবাহিনীতে ডাক্তার হিসেবে যোগদান করেন। সাহিত্যের প্রতি পাগল নিহার রঞ্জন গুপ্ত অসংখ্য উপন্যাস রচনা করেছেন। মাত্র ষোল বছর বয়সে তার প্রথম উপন্যাস ‘‘ রাজ কুমারী’’ ছাপা হয়। তার লিখিত প্রায় দুইশতাধিক উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে এর মধ্যে চল্লিশটিরও বেশী উপন্যাসের চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে। ১৯৮৬ সালের ২০ জানুয়ারি এই মহান সাহিত্যিক কলিকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।
বিশ্বখ্যাত সংগীত শিল্পী কমল দাস গুপ্ত ১৯১২ সালের ২৮ জুলাই তার পিতা তারাপ্রসন্ন দাস গুপ্তের ব্যবসায়স্থল কুচবিহারেজন্ম গ্রহণ করেন। তার পৈত্রিক নিবাস ছিল নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার বেন্দা গ্রামে । ১৯৩২-১৯৪৭ সাল পর্যন্ত তিনি চার হাজারের ও অধিক গানে সুরারোপ করেন। ১৯৩৬-১৯৬৭ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলা, ইংরেজী , তামিল, হিন্দী প্রভৃতি ভাষার ছবিতে সংগীত পরিচালনা করেন। তিনি নজরুল সংগীতে বিশেষজ্ঞ ও সুরাকার । ১৯৭৪ সালের ২০ জুলাই ঢাকার পিজি হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
লেঃ মতিউর রহমান লোহাগড়া উপজেলার মধুমতি তীরবর্তী মাকরাইল গ্রামে ১৯৩৬ সালে ১ ডিসেম্বর তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সোলাইমান মোল্যা, তিনি লাহুডিয়া উচ্চ বিদ্যালয় হতে ম্যাট্রিক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে গণিত শাস্ত্রে এমএসসি পাস করেন। ১৯৬১ সালে তিনি পাকিস্তানের নৌবাহিনীতে যোগদান করেন। তিনি ১৯৬৯ সালে অন্যান্যদের সাথে বিখ্যাত আগড়তলা মামলায় আসামী হয়। বঙ্গবন্ধুর কাধে কাধ মিলিয়ে রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। দল গঠনে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় ।১৯৮৬ সালের ৫ মে তিনি মৃত্যবরণ করেন।

চারণ কবিয়ালসম্রাট বিজয় সরকার ১৯০৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি নড়াইল সদর উপজেলার ডুমদি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম নবকৃষ্ণ বৈরাগী ও মাতার নাম হিমালয় কুমারী বৈরাগী। কিশোর বয়সেই তিনি গ্রাম্য কবি পুলিন বিহারী ও পঞ্চানন মজুমদার এর সাথে পাচালী গান গেয়ে খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৩৬ সালে তিনি কলিকাতায় গান করতে গেলে সেখানে কবি গোলাম মোস্তফা বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, পল্লী কবি জসীমউদ্দিন, আববাস উদ্দিন, সাহিত্যিক হাবিবুল্লাহ বাহার, ধীরেন সেন প্রমূখের সাথে তাঁর পরিচয় ঘটে । ১৯৮৫ সালের ৪ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তিনি প্রায় চারশতাধিক গান রচনা করেন।
চারণ কবি জারী সম্রাট মোসলেম উদ্দিন বয়াতী ১৯০৪ সালে নড়াইল সদর উপজেলার তারাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আব্দুল ওয়াহেদ ও মাতার নাম মুসলিমা বেগম। বাল্যকাল হতেই তিনি সংগীতানুরাগী ছিলেন এবং জারী, ভাব, মুর্শিদী ও পয়ার ইত্যাদি গান গাইতেন। তৎকালের বিখ্যাত সব গায়কের সাথে তিনি গানের পাল্লা দিয়ে খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর গান শুনে প্রায় সকল দর্শকই কান্নায় ভেঙ্গে পড়তেন। ১৯৯০ সালের ১৯ আগস্ট নিজ গ্রামে এই মহান গায়ক মৃত্যুবরণ করেন।
দানবীর ফাজেল আহমেদ মোল্যা ১৮৭৯ সালের নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার ১১ নং পেড়লী ইউনিয়নে পেড়লী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আলহাজ্ব নৈমুদ্দিন মোল্যা মাতা বড়ু বিবি। তিনি কৈশরেই বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসায় শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যে প্রচুর জমি ক্রয় করে হাজী নৈমুদ্দিন ট্রাস্ট গঠন করেন। মুসলমানদের শিক্ষার জন্য তিনি অনেকগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় অনেক রাস্তাঘাট তৈরি হয়। দানশীল ও সমাজসেবক ফাজেল আহমেদ মোল্যা ১৯৩৪ সালের ২৫ জুলাই মাত্র পঞ্চান্ন বছরে মৃত্যুবরণ করেন।
মন্তব্য